কিছু বঙ্কিম কথা…

4
52

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

“ ৯৯৭ বঙ্গাব্দের নিদাঘশেষে একদিন একজন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমন করিতেছিলেন।“ ( বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দুর্গেশনন্দিনী, প্রথম খন্ড, প্রথম পরিচ্ছেদঃদেবমন্দির)

দুর্গেশনন্দিনী বাংলা ভাষা ও ভাবের নবযুগ সূচনা করেছিল। বাংলা কথাসাহিত্যে ‘আগে ছিল না’ এমন ভাষা নির্মাণ ও ব্যবহারে অবশ্যই যে নাম সবার আগে আসে, তা বঙ্কিমচন্দ্রের এবং তার পরে রবীন্দ্রনাথের। কী সিনেম্যাটিক শুরু দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের! ঠিক যেন পর্দা সরে গেল। প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার। কির্‌কির্‌ করে আওয়াজে শুরু হল ছায়াছবি…… নায়কের প্রবেশ। ঐ একাকী অশ্বারোহী স্বয়ং বঙ্কিম না তো, যিনি এক নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চলেছেন? নিদাঘতপ্ত রুক্ষ্ম পথে যাঁর আগামী যাত্রা এবং যাত্রার শেষে বাংলায় আসন্ন এক নতুন কথারাজ্যের সূত্রপাত!

বঙ্কিমচন্দ্র কোনো লেখা প্রকাশের পূর্বে কখনই তা কাউকে পড়ে শোনাতেন না। এমনকি ছোটো ভাই ছাড়া কাউকে রচনার পান্ডুলিপি ছুঁতে পর্যন্ত দিতেন না; কিন্তু দুর্গেশনন্দিনীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়েছিল। কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে পুরো বইখানা অভ্যাগতদের সামনে বঙ্কিমচন্দ্র পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। দু-দিন লেগেছিল। অনেক লোক এসেছিলেন। তার মধ্যে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিল। ভাটপাড়ার পণ্ডিতেরাও এসেছিলেন। সবাই নিঃশব্দে শুনতেন। সে সময় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটলে বা ঘরে কেউ প্রবেশ করলে শ্রোতারা অত্যন্ত বিরক্ত হতেন। কেউ আফিম নিতেন, কেউ তামাক , তারা সেসবও ভুলে গিয়েছিলেন। একজন প্রবীণ মানুষ বারেবারে জোর গলায় সাধুবাদ দিয়ে যাচ্ছিলেন মধুসূদন স্মৃতিরত্ন বলেছিলেন – “ গল্প ও ভাষার মোহিনী শক্তিতে আমরা এতই আকৃষ্ট হইয়াছিলাম যে, আমাদের সাধ্য কি যে অন্যদিকে মন নিবিষ্ট করি!” বিখ্যাত সমালোচক ক্ষেত্রনাথ ভট্টাচার্য এই উপন্যাসখানির মধ্যে ভাবী সাহিত্যসম্রাটের সন্ধান পান এবং ভবিষ্যৎবাণী করেন যে আরো উৎকৃষ্ট সাহিত্য এই কথাসাত্যিক বঙ্গপাঠকসমাজকে উপহার দেবেন।

ভুললে চলবে না, বাংলা ভাষা তখন সদ্য কাব্যের আকাশ ছেড়ে গদ্যের সমতলভূমিতে পা রেখেছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সংস্কৃতবহুল ভাষা যে সাহিত্য-সৃষ্টির অনুকূল বাহন নয় তা অনেকেই বুঝেছেন। সমাজ ও সময় সদা পরিবর্তনশীল, তাই বদলে নিতে হয় ভাষাকেও। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথমে সম্পূর্ণরূপে বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতির প্রভাবমুক্ত হয়ে উঠতে পারেন নি। তাঁর সাহত্যরচনার পেছনে প্রধান কারণ যেটি ছিল তা হল দেশ ও সমাজের কল্যাণসাধন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সেই সময় “সব্যসাচী বঙ্কিম এক হস্ত নিবারণকার্যে নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন। একদিকে তিনি অগ্নি জ্বালাইয়া রাখিতেছিলেন, আর একদিকে ধূম এবং ভস্মরাশি দূর করিবার ভার নিজেই লইয়াছিলেন।“ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৮৫৩ থেকে শুরু তাঁর সাহিত্যসেবা, আজ এত বছর পেরিয়েও বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস এবং অন্যান্য রচনা সাহিত্যের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর “কমলাকান্ত” এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। উপন্যাসের মধ্যে কপালকুন্ডলা সর্বাধিক ভাষায় অনুদিত, এমনকি ইংরাজি ও জার্মান ভাষাতেও এর অনুবাদ হয়েছিল।

আসলে, যেই না নতুন কিছু হয় অমনি শুরু হয়ে যায় বিপক্ষের তীরনিক্ষেপ, তখনও হত, এখনো হয় বৈকি! অসন্তুষ্ট দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাঁর সম্পাদিত সোমপ্রকাশে বঙ্কিম ও তার অনুরাগীদের নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা শুরু হয়। এরপর  ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্গদর্শন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- “বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙালীর হৃদয় একেবারে লুঠ করিয়া লইল। “রামতনু লাহিড়ি ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ”-এ আছে – “ প্রতিভা এমনি জিনিস, ইহা যাহা কিছু স্পর্শ করে তাহাকেই সজীব করে। বঙ্কিমের প্রতিভা সেইরূপ ছিল। তিনি তাঁহার অমৃতময়ী ভাষাতে সাম্য নীতি এরূপ করিয়া ব্যাখ্যা করিতেন যে দেখিয়া যুবকদলের মন মুগ্ধ হইয়া যাইত।“ এভাবেই তাঁর জীবিতকালে বঙ্কিমচন্দ্র মুখ্যত ঔপন্যাসিক এবং পরবর্তী সময়ে “বন্দে মাতরম” মন্ত্রের উদ্‌গাতা রূপেই আখ্যাত ছিলেন। কেবল রসসৃষ্টিই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, তাঁর লক্ষ্য ছিল স্বদেশবাসীকে উচ্চাঙ্গের কর্মযোগে দীক্ষিত করা।

রবীন্দ্রনাথ এই বঙ্কিমী ভাষাকেই অনুসরণ করেছিলেন গদ্যরচনায়। পরে অবশ্য ঘরে-বাইরেতে এসে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ভাষাও তার নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়। ভাষা তো বদলাবেই, কারণ কথাসাহিত্যের উদ্দেশ্যই হল আরো সার্থকরূপে প্রকাশ করা। শেষের কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই সমালোচনার ভঙ্গিতে এ বিষয়ে তাঁর মত জানিয়েছেন। আজ বাংলা ভাষার সাহিত্যে বিদেশী শব্দ, একেবারে কথ্য ভাষা, আঞ্চলিক শব্দ, এমনকি “স্ল্যাং” পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। এও এক ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ সবই নিজেকে আরো বেশি জানা, আরো সহজবোধ্য করে তোলা।

এ প্রসঙ্গে কমলকুমার মজুমদারের কথা আসবেই। বলা যেতে পারে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পরে ভাষা নিয়ে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন অন্য কারো কলমে দেখা যায় নি। কমকুমার বাংলাভাষার প্রচলিত রীতি বা কাঠামোকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন স্টাইল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলে, হয়তো তাঁর ব্যক্তিজীবন এর পেছনে খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। আজীবন বেহিসেবী, খামখেয়ালী, যথেষ্ট প্রতিভার অধিকারী হয়েও যে স্বীকৃতি তিনি পান নি, যে সমালোচনা তাঁকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে, তাঁর ভাষাও এরই ফসল। যেমনটি ঘটেছিল হয় তো তাঁর অনেক অনেক আগের মধুকবির বেলায়। জীবনের ’রিজেকশন’ মানুষকে বিদ্রোহী করে। যেমন করেছিল দুখু মিঞা নজরুলকেও। কমলকুমারকে আপামর বাঙালি সেভাবে গ্রহণ করেন নি। তিনি রয়ে গেছেন মুষ্টিমেয় বিদগ্ধ সাহিত্যনুরাগীর প্রিয় বইয়ের তাকে। এর কারণ তাঁর আপাত জটিল ভাষা রীতি।

এভাবেই বহতা ভাষানদীর জল বহুদূর গড়িয়ে গেছে। হাজার হাজার কবি-ঔপন্যাসিক-গল্পকার-নাট্যরচয়িতা এসে বাংলার আকাশে তাদের উড়ান রেখে গেছেন। পাঠক পড়েছে, প্রশ্ন করেছে, বুঝতে চেয়েছে, বুঝে অথবা না বুঝে সমালোচনা করেছে।ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করে গেছে আর দ্বিগুন মূল্য চুকিয়েছেন লেখক-শিল্পীরা। কলেজে পড়ার সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলাম – কেন লিখলেন “ধর্মতলায় দিন দুপুরে পথের মধ্যে হিসি করি।“ তখন বুদ্ধি কম, বোধও। স্বভাবসিদ্ধ মৃদু হেসে কবি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কেন এই বিশেষ শব্দের প্রয়োগ? কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতো প্রথাকে ভেঙে ফেলতে গেলে যে রাগ প্রকাশ , তা কি নিয়ম মেনে হয়? কালপুরুষে অর্কের মুখে যে বস্তির ভাষা দেখে ‘শকড’ হয়েছিল মধ্যবিত্ত, তা দিয়েই বুঝিয়ে দেওয়া গিয়েছিল মাধবীলতা আর অনিমেশের যন্ত্রণা, আর কিচ্ছু লাগে নি। এতটাই জোর ভাষার। আজ ভাষা গঠন নিয়ে তেমন সমালোচনার পরিসর নেই হয়তো, তবে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতটা উদার আমরা তা নিয়ে তর্ক বাঁধে আকছার। ভাষাশিল্পী জানেন কোথায় কী লিখতে হয়, বাকিটা তো শিল্প নয়। শুদ্ধ বাংলা শব্দই লিখব না মিশিয়ে দেব অন্য ভাষার খাদ? শ্রীজাত যখন লিখছেন ‘জিয়া নস্টাল’ কিংবা চন্দ্রবিন্দু যখন “প্লিস ঘুম হয়ে যাও চোখে” বলছে তা নিয়ে ভাববেন কেন যে ওঁরা বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পান নি? যা প্রকাশ করেছেন তা হৃদয়গ্রাহী হয়েছে একশো শতাংশ, এটাই শেষ কথা। নইলে নজরুল ভাবুন- “আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন, দিল ওহি মেরা ফাস গয়ি”-। আসলে খাদ একটু লাগে, নইলে গয়না গড়া যায় না। কতটা খাদ, তা জানেন স্বর্ণকার।

শক্তি লিখলেন –“লিখিও উহা ফিরৎ চাহ কি না” । প্রশ্ন করা হল হঠাৎ সাধু ভাষা? চিরকালের বোহেমিয়ানের উত্তর ছিল- থাক না, ভালোই তো শোনাচ্ছে। বদলান নি, আর বাকিটা তো ইতিহাস!

অনেকক্ষেত্রেই সৃষ্টি তার সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে, কিন্তু মহাকালের রায়ে পরের প্রজন্মে তাই হৃদয়ে স্থায়ী আসনটি দখল করে আছে – এমন উদাহরণ ভুরি-ভুরি মিলবে পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্যে। শুচিবায়ু নয়, ভাষার শক্তি অন্য জায়গায়।

বর্তমানে বাংলা ভাষা তার অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে, তাই ভাষাকে আরো শক্তিশালী, আরো গ্রাহ্য করাই মূল ভাবনা হওয়া দরকার। যাঁর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম,বন্দেমাতরম স্রষ্টা সেই ঋষি বঙ্কিমের উক্তি – “যাহা উত্তম তাহা সকলেই পড়িতে চাহে; যে না বুঝিতে পারে, সে বুঝিতে যত্ন করে, এই যত্নই সাধারণের শিক্ষার মূল।“

সমালোচনা হোক। সম আলোচনা হোক। তা যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়, মহৎ উদ্দেশ্যে লেখা হয়। সমালোচনা হল সেই অগ্নিতে ঘিয়ের ছিটে যা জ্বলে ওঠায়।

(Visited 17 times, 1 visits today)