এবার বিধানসভা দখলে ১৮০-র টার্গেটে ঝাঁপাচ্ছে গেরুয়া ব্রিগেড

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | August 3, 2019 | 7:22 pm

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এবার পাকাপাকি ভাবেই টার্গের বেঁধে দিলেন অমিত শাহ। গত রবিবার রাজ্যের বিজেপি নেতাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকে ২০২১ কেই পাখির চোখ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি। রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষ -সহ পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিজেপি নেতৃত্বকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন বিধানসভার ২৫৪ আসনের মধ্যে ১৮০ টি আসন কমপক্ষে বিজেপিকে দখল করতেই হবে। এবং সেজন্য রাজ্য শাসক তৃণমূলকে চাপে রাখতে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সমস্ত রকম ইস্যু ভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে তোলপাড় করে দিতে হবে। এমনকি হাতে-গরম কাটমানি কান্ডকে ঘিরেও বড়সর আন্দোলনে নামতে তিনি নির্দেশ দেন বলে সূত্রের খবর।

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে ৪২ আসনের মধ্যে ১৮ টি আসন জিতে ইতিমধ্যেই বঙ্গ-বিজেপি রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই পাকা করে নিয়েছে,এবং শাসক দল তৃণমূলের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে সমর্থ হয়েছে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গের যে ১৮ টি আসনে তারা লোকসভায় জিতেছে দেখা যাচ্ছে সেই সব কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১২৯ টি বিধানসভায় তারা তৃণমূলকে ডিগবাজি খ্যাইয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও কমপক্ষে প্রায় ২৯ টি বিধানসভায় তারা মাত্র ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে তৃণমূলের থেকে পিছিয়ে আছে। হিসেব বলছে লোকসভার নিরিখে ইতিমধ্যেই বিজেপি ২৫৪ বিধানসভার মধ্যে ১৫৮ টি বিধানসভায় নিজেদের গড় শক্তিশালী করতে পেরেছে। তাই এই বিধানসভা গুলো নিয়ে বঙ্গ বিজেপির নিশ্চিত জয় সম্পর্কে কোনও চাপ নেই বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

এই মুহূর্তে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হলে তৃনমূল যে শাসকের আসন থেকে ছিটকে যাবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ ২৯৪ আসনের মধ্যে প্রধান বিরোধী বিজেপি ইতিমধ্যেই ১৬০ টি আসন পাওয়ার মতো জায়গায় আছে। এদিকে ২০১৬ বিধানসভায় যে বিজেপি মাত্র ৩ টি আসনে জিতে ছিলো।এখন তাদের বিধায়ক সংখ্যা ১২ টি। ইতিমধ্যেই অন্যদল থেকে বিজেপিতে ৬ জন বিধায়ক যোগ দিয়েছেন।

যাদের মধ্যে মনিরুল ইসলাম, শুভ্রঅংশু রায়, সুনীল সিং এর মত বিধায়কও অন্যতম। এবারের বিধানসভা উপনির্বাচনেও ৪ টি আসনে বিজেপির
জয়লাভ হয়েছে। বাকি রয়েছে খড়গপুর সদর,কালিয়াগঞ্জ,ও করিমপুর বিধানসভা উপনির্বাচন। এখানেও খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জে বিজেপি এগিয়ে আছে লোকসভার ভোটের ফল অনুসারে। শুধুমাত্র করিমপুর বিধানসভায় এগিয়ে তৃনমূল।

অন্যদিকে মুকুল রায়ের কথা মতো “এ তো অভি ট্রেলর হ্যায়…. ফিল্ম কা জাদা বাকি হ্যায়” বলতে বলতে তারা সাতদফা নির্বাচনের মতোই সাত পর্যাইয়ে তৃণমূলকে ২০২১ সালের এর আগেই ভেঙ্গে দেওয়ার যে আপাত প্রস্তুতি নিয়েছে,তাতেও তারা দারুন সফল। ইতিমধ্যেই বিধায়কদের পাশা পাশেই দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পরিষদ সহ বিজেপির দখলে ।

বেশ কয়েকটি পৌরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েতও তারা শাসকের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে অনাস্থা ভোটে। মুর্শিদাবাদের ডমকল পুরসভার মতো তৃনমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও থাবা বসাতে চলেছে আর কিছু দিনের মধ্যেই।বিজেপি সূত্র অনুযায়ী লোকসভার ফলের নিরিখে প্রায় ১৫৮ টি বিধানসভায় এগিয়ে থাকার মতোই আসন্ন নির্বাচনের অপেক্ষায় ১২২ টি পৌরসভার মধ্যে প্রায় ১০১ টিতে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে এগিয়ে আছে বিজেপি। আর আগামীতে ভোট হতে হবে এমন ৬ টি পৌরণীগম এর মধ্যে ৪ টিতেও এগিয়ে বিজেপি।

অন্যদিকে ভোটের শতাংশেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরের তাদের সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। ২০০৯ থেকে প্রতিটা ভোট পর্বেই তাঁদের ভোট শতাংশ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। যে বিজেপি ২০০৯ সালের লোকসভায় এ রাজ্যে ৬.১৪ শতাংশ ভোট পায়, অদ্ভুতভাবে ২০১১ সালের বিধানসভায় তাদের ভোট বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০ শতাংশে।আবার ২০১৪ র লোকসভায় আসানসোল ও দার্জিলিং আসনে জয়ী হয়ে তারা গোটা বাংলায় ভোট পায় প্রায় ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও সিপিএম জোট বেঁধে লড়াই করার কারণে বিজেপি খানিকটা ব্যাকফুটে গিয়ে ভোট পেয়েছিল ১২.২৫ শতাংশ।

পরে অবশ্য শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুকুল রায়ের বিশেষ সাংগঠনিক যোগ্যতায় জেলায় জেলায় গ্রামের মানুষ শাসকের অত্যাচার সহ্য করেও বিজেপিকে ভোট দেয়। আর ২০১৮ তে তাদের ভোট আবারও বৃদ্ধি পেয়ে এক লাফে প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছে যায়। প্রবল ছাপ্পা,রিগিং,ভোট লুঠ করেও শাসক তৃনমূল বিজেপি কে তেমন আটকাতে পারেনি। বিজেপি অভাবনীয় ভোট বৃদ্ধিতে সিপিএম কংগ্রেস সকলেরই চক্ষু চারকগাছ হয়ে যায়। বস্তুত ২০১৮ র পাঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যের গ্রামে গ্রামে মানুষের মন পরিবর্তন হতে থাকে।

একদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষের হুংকার, মুকুল রায়ের নির্বাচনী কৌশল,কৈলাশ বিজয়বর্গিও মতো কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতি এটা যেমন আঞ্চলিক স্তরে মানুষের মধ্যে বিজেপির প্রতি নির্ভরতা বাড়ায় অন্যদিকে ২০১৯ এ নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ জুটির প্রবল হওয়া বিজেপিকে ২৭ শতাংশ থেকে ২০১৯ লোকসভায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে দেয়। অনেকের মতে তৃনমূল এবারের লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার,বসিরহাট, যাদবপুর,ঘাটাল,কাঁথি ইত্যাদি কেন্দ্রে রিগিং না করতে পারলে বিজেপি ভোট পার্সেন্টেজ তাদেরও ছাপিয়ে যেত,এবং সেক্ষেত্রে বিজেপি ৪২ এ ২৩ আসন পাওয়ার যে জোশ ছিল সেটাও মিথ্যে হতো না।

আর শাসকের সমস্ত বিরোধিতা সত্বেও ৪২ আসনে ১৮ টি জয় করা এবং তৃণমূলের ৪৩ শতাংশ ভোটের দোরগোড়ায় পৌঁছে বিজেপির ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়াটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে আসলে এই মুহূর্তে মানুষ বিকল্প হিসেবে বিজেপি কেই মেনে নিচ্ছেন।

লোকসভায় সাফল্য লাভের পর থেকেই বঙ্গ বিজেপির যে চনমনে ভাব,তাদের নিচুতলার কর্মীদের সাহসী মনোভাব এলাকায় এলাকায় শাসক বিরোধী নানা কার্যক্রমেই তা প্রমাণিত হয় গেছে। একদিকে রাজ্য বিজেপির এই ঝড়ের বেগে উত্থান এবং একই সঙ্গে কেন্দ্রে দ্বিতীয় বারের জন্য নরেন্দ্র মোদির একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন সামগ্রিকভাবে এমনিতেই বাংলায় শাসক তৃণমূলকে একঘরে করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে তৃণমূলের পতন প্রায় অবসাম্ভাবি। তার অন্যতম কারণ একদিকে তাদের সাম্প্রতিক দুর্বল সংগঠন,প্রশাসনিক ব্যর্থতা অন্যদিকে ভুল ও অপৰিকল্পিত স্ট্রাটেজি। সন্দেশখালী,ভাটপাড়া ইত্যাদি কাণ্ডে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনজারি হওয়ার যে হওয়া উঠেছিল তা আপাতত থমকে।

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তথা রাজ্য বিজেপি এর বিরুধ্যেই। তারা মনে করছেন এই সময় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের যে সমর্থন তাদের সঙ্গে আছে সেটাকে পুঁজি করেই তারা আস্তে ধীরে বল খেলতে চান। এতে একদিকে যেমন মানুষের ভরসা,বিশ্বাস ও আস্থা জন্মাবে তেমনিই তাদের প্রতি তৃনমূল ও অন্য দলের বিধায়ক, কাউন্সিলর ও জেলা পরিষদ সদস্যদের আনুগত্য বাড়বে। আর এখানেই পর্যবেক্ষকদের অভিমত যেভাবে তৃনমূলি নেতারা বিজেপি তে যোগ দিতে উদ্যোগী হয়েছেন।

আগামী ছয় পর্যাইয়ে বিজেপি যে তৃনমূল সরকারের গোছানো ঘর ২০২১ এর আগেই ভেঙ্গে তছনছ করে বিধানসভায় অনাস্থা আনবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

তাই অমিত শাহ সঙ্গে দিল্লিতে রাজ্যের বিজেপি কর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠক ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটের দেরী থাকলেও শাসক তৃণমূলের নানা ভুল খুঁজে এবং তারা ভুল করে ফাঁদে পা দিয়ে যাতে মানুষ ও তাদের দলের নেতাদের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা হারায়, সেটাই হবে এখন বিজেপি র সাপে বর।

তাই কাঠমানির ইস্যু র মতো নানা বিষয়কে সামনে রেখে এখন মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা যেমন তাদের স্ট্রাটেজি তেমনই তৃনমূল সহ অন্য দলের বিধায়কদের দলে টেনে ২০২০ সালেই বিধানসভায় অনাস্থা আনাটাও তাদের অন্যতম কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এখন সময়ই বলবে শেষ কথা। আমরা অপেক্ষায়।

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট